পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র ৬ষ্ঠ অধ্যায়: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। অন্য কথায়, রাজনৈতিক দল ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। আবার, যেকোনো শাসনব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের ওপর। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই রাজনৈতিক দলের ধারণা, বৈশিষ্ট্য, কার্যাবলি, নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয়ে এ অধ্যায়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
উত্তর: কোনো দেশে যদি শুধু একটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান থাকে কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয় তবে তাকে একদলীয় ব্যবস্থা বলে। একদলীয় ব্যবস্থা সাধারণত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি হয় না। এমন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা একটি দলের হাতেই ন্যস্ত থাকে। একদলীয় ব্যবস্থাকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বলা হয়। বিশ্বের সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একদলীয় ব্যবস্থা বিরাজমান। একদলীয় ব্যবস্থার উদাহরণ হলো গণচীন।
উত্তর: গণতন্ত্রে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ভূমিকা ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য করেন। চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলো সরকারি সকল কর্মকাণ্ডে সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সরকারের নীতি অগণতান্ত্রিক বা সরকার স্বেরাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তারা গঠনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে সজাগ করে দেয়।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা মন্দ শাসন প্রতিহত করে সুশাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। জনসাধারণের বিভিন্ন রকম সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বৃত্তিগত প্রভৃতি স্বার্থ আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে জনগণকে অনুপ্রাণিত করে। এভাবে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী গণতন্ত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
উত্তর: রাজনৈতিক দল বলতে একদল সংঘবদ্ধ জনসমষ্টিকে বোঝায়, যারা রাষ্ট্রীয় সমস্যাবলি ও এর সমাধানের উপায় সম্পর্কে ঐকমত্য পোষণ করে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সচেষ্ট থাকে। সুনির্দিষ্ট কতিপয় নীতিমালার ভিত্তিতে সমমনা জনগোষ্ঠী সংগঠিত হওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক দলব্যবস্থা একটি অপরিহার্য উপাদান। তাই বলা যায়, রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা ব্যতীত গণতান্ত্রিক শাসন অকল্পনীয়।
উত্তর: যে ব্যক্তি বা নেতৃত্বকে জনগণ অন্ধভাবে শ্রদ্ধা, ভক্তি নিবেদন করে এবং যার বক্তব্য দ্বারা জনগণ ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে তাকে সম্মোহনী নেতৃত্ব বলে। সম্মোহন শব্দটির অর্থ হচ্ছে মোহবিষ্ট করা। কোনো ব্যক্তির বিশেষ ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলি দিয়ে মানুষকে মনমুগ্ধ করার এক বিরল ক্ষমতা। আর এ বিশেষ ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলিই সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন নেতাকে জনগণের নিকট হতে পৃথক করে। তিনি অবশ্যই অতি-প্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী।
উত্তর: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হলো এমন একটি গোষ্ঠী যার সদস্যরা কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি ব্যক্ত করে এবং তা পূরণ করার চেষ্টা করে। চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের সঠিক স্বার্থের কথা বিবেচনায় না এনে কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণির দাবি ব্যক্ত করে সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করে বলে এই গোষ্ঠীকে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বলা হয়। শিক্ষক সমিতি, বণিক সংঘ, শ্রমিক ইউনিয়ন, ব্যাংক কর্মচারী ফেডারেশন প্রভৃতি চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
উত্তর: সরকারের যে বিভাগ দেশ পরিচালনা করে সে বিভাগের নাম শাসন বিভাগ। শাসন বিভাগের দুটি কাজ হলো-
ক. অভ্যন্তরীণ শাসন পরিচালনা: শাসন বিভাগের প্রধান কাজ হলো দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও জনজীবনের নিরাপত্তা রক্ষা করা।
খ. সামরিক কার্যাবলি দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার গুরু দায়িত্ব শাসন বিভাগের ওপর ন্যস্ত থাকে। রাষ্ট্রপ্রধান সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সেনাবাহিনী গঠন, পরিচালনা এবং দেশ রক্ষার প্রয়োজনে বেসামরিক শক্তিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে কাজ সম্পাদন করে।
উত্তর: আইন প্রণয়ন হচ্ছে আইন বিভাগের প্রধান কাজ। আইন বিভাগ জনসাধারণের ইচ্ছা ও জাতীয় আদর্শের সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন নতুন আইন তৈরি করে এবং প্রয়োজনে প্রচলিত আইনের সংশোধন বা পরিবর্তন করে। সাধারণত আইন বিভাগ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এবং সকল বিষয়ের ওপর আইন প্রণয়ন করে।
উত্তর: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন দুটির বেশি দল রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের লড়াইয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে, তখন তাকে বহুদলীয় ব্যবস্থা বলে। বহুদলীয় ব্যবস্থায় সাধারণত দেশের সাধারণ নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না। ফলে নির্বাচনে জয় লাভের জন্য অনেক সময় সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে ‘সম্মিলিত সরকার” গঠিত হয়। ফ্রান্স, ইতালি, বাংলাদেশ, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে এরূপ বহুদলীয় ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
উত্তর: মহান ও উদারমনা ব্যক্তিই সাধারণ জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে পারেন বলে উদারতাকে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বলা হয়। উদারতার কারণেই নেতা ব্যক্তিস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে সার্বিক সামাজিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারেন। উদারতা থাকলে নেতার মধ্যে সংকীর্ণতা, দীনতা, পরশ্রীকাতরতা, স্বার্থপরতা ও হীনম্মন্যতা ঠাঁই পাবে না। এসকল কারণেই উদারতাকে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ বলা হয়।
উত্তর: একজন শিক্ষক বিশেষজ্ঞসুলভ নেতৃত্বের অধিকারী। বিশেষ কোনো জ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, দক্ষতা প্রভৃতির জন্য কোনো ব্যক্তি যে নেতৃত্ব লাভ করেন, তাকে বিশেষজ্ঞসুলভ নেতৃত্ব বলে। একজন শিক্ষক তার পেশার সাফল্য দ্বারা মানুষকে প্রভাবিত করতে পারেন, ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন। তার ব্যক্তিগত দক্ষতা, সততা ও সুনামই অপবকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। [
উত্তর: নেতৃত্বের চারটি গুণাবলি হলো-
i. শিক্ষা: নেতা হবেন উচ্চ শিক্ষা ও বিশেষ প্রজ্ঞার অধিকারী।
ii. দূরদৃষ্টি জটিল সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের। তাই নেতাকে অবশ্যই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে।
iii. চারিত্রিক কঠোরতা ও কোমলতা চারিত্রিক গুণ একজন নেতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। চরিত্রের কোমলতা যেমন নেতাকে জনগণের কাছে নিয়ে আসে তেমনি তার কঠোরতা জনগণকে শৃঙ্খল ও সজাগ করে রাখে।
iv. বাগ্মিতা ও উত্তম শ্রোতা নেতা যেমন একদিকে হবেন বাগ্মী, তেমনই অন্যদিকে তিনি হবেন ধৈর্যশীল শ্রোতা। তবেই জনগণের সমস্যা সমাধান করা নেতার জন্য সহজ হবে।
উত্তর: জনগণ ও সরকারের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের মিলন সেতু হলো রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই জনগণের অভাব-অভিযোগ সরকারের নিকট পৌছায় এবং সরকারও জনগণের আশা- আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। ফলে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটাতে রাজনৈতিক দলের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। তাই বলা যায়, রজনৈতিক দলই জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে।
উত্তর: চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক সামাজিকীকরণের মাধ্যম বলা হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের ন্যায় চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীসমূহও দলের পক্ষ থেকে জনসাধারণের মধ্যে কেবল রাজনৈতিক প্রচারকার্যই পরিচালনা করে না, রাজনৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চারেও সাহায্য করে। এভাবে রাজনৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চার করে চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সামাজিকীকরণের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উত্তর: রাজনৈতিক দলের যথাযথ নেতৃত্ব গণতন্ত্র তথা সুশাসন সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সুশাসনকে অবজ্ঞা করে নেতৃত্বে সফলতা আসতে পারে না। কেননা নেতৃত্বের একটি বিশেষ ভিত্তি হলো গণতন্ত্র তথা সুশাসন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেতৃবৃন্দ সুশাসনকে পুঁজি করে উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করে। সর্বোপরি বলা যায়, নেতৃত্বই সুশাসন তথা গণতন্ত্রের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
উত্তর: নেতৃত্ব বলতে সাধারণত নেতার গুণাবলিকে বোঝায়। নেতৃত্ব শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ Leadership. Leadership শব্দটির উৎপত্তি ইংরেজি ‘Lead’ শব্দ হতে, যার অর্থ পরিচালনা করা বা পথ দেখানো। পৌরনীতিতে নেতৃত্ব বিশেষ অর্থ বহন করে। পৌরনীতিতে নেতৃত্ব হলো একজন ব্যক্তি বা একদল ব্যক্তির কাম্য গুণাবলি, যা সমাজের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যদের উদ্দীপ্ত করে।
উত্তর: নেতৃত্বের প্রথম অপরিহার্য গুণ হলো ব্যক্তিত্ব। নেতাকে অবশ্যই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হতে হবে। কারণ ব্যক্তিত্বের সম্মোহনী শক্তির বলে নেতা সকলের নিকট শ্রদ্ধা ও আনুগত্য লাভ করে। চারিত্রিক দৃঢ়তা, মাধুর্য, নমনীয়তা, তেজস্বিতা, চারিত্রিক উৎকর্ষতা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বই নেতৃত্বের পদে আসীন হতে সাহায্য করে। তাই নেতৃত্বের অপরিহার্য গুণ হলো ব্যক্তিত্ব।
আশাকরি “রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব ও সুশাসন – পৌরনীতি ও সুশাসন ১ম পত্র ৬ষ্ঠ অধ্যায়” নিয়ে লেখা আজকের আর্টিকেল টি আপনাদের ভালো লেগেছে। পৌরনীতি ও সুশাসন এর সকল অধ্যায় এর প্রশ্নোত্তর পেতে এখানে ক্লিক করুন। ভালো থাকবেন সবাই, ধন্যবাদ।
Leave a Reply